গতকাল মূল্যবান ধাতুটির দাম প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। শক্তিশালী ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার আরো বাড়তে পারে, এমন ধারণার কারণে স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। খবর রয়টার্স।
বাজারসংশ্লিষ্টরা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান শান্তি আলোচনা পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করছেন। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমার সম্ভাবনাও স্বর্ণের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত গতকাল স্পট গোল্ডের দাম আউন্সপ্রতি দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭১ ডলার ২৮ সেন্টে নেমে আসে। এর আগে দাম ১১ জুনের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছয়। একই সময় আগামী আগস্টের সরবরাহের চুক্তিতে মার্কিন স্বর্ণের আগাম দামও ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৮৮ ডলার ৮০ সেন্টে দাঁড়ায়।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংক ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভো বলেন, ‘শক্তিশালী মার্কিন ডলার এখনো স্বর্ণের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। একই সঙ্গে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) খাতে বিনিয়োগের আগ্রহও খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাজারে ধাতুটির চাহিদা দুর্বল রয়েছে।’
মার্কিন ডলার সূচক আরো শক্তিশালী হয়েছে গতকাল। এটি ১৩ মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। ডলারের মূল্য বাড়লে অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী ক্রেতার জন্য স্বর্ণ কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা কমে যেতে পারে।
এদিকে বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে হিসাব কষছেন। সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বাজার এখন চলতি বছরে ফেডের তিন দফা সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিচ্ছে।
সাধারণত সুদহার বাড়লে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়। কারণ স্বর্ণ একটি ‘মুনাফাহীন’ সম্পদ। ফলে উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগকারীরা অন্যান্য সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
ফেডের বৈঠকের পর থেকে স্বর্ণের দাম এরই মধ্যে ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় যে তীব্র মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চায় ফেড। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনার পর জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। তবে সুদহার বাড়ানোর বিষয়ে ফেডের কঠোর অবস্থানের কারণে জ্বালানি তেলের দাম কমার সুফল স্বর্ণের বাজারে দেখা যায়নি।
বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় সূচক বা পিসিই তথ্যের অপেক্ষায় আছেন। আজ এ তথ্য প্রকাশ হওয়ার কথা। এটি মূল্যস্ফীতি পরিমাপের ক্ষেত্রে ফেডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত।
ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি সম্পর্কে নতুন ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে এ তথ্য থেকে। ফলে স্বর্ণের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বাজারে আলোচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার জানান, ইরান অনির্দিষ্টকালের জন্য পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরান এ দাবি অস্বীকার করে। ফলে দুই দেশের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক শান্তি সমঝোতা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। গতকাল রুপার দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৬১ ডলার ১২ সেন্টে নেমে আসে। প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ৬২৯ ডলারে দাঁড়ায়। আর প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ১ হাজার ২১৭ ডলার ২৫ সেন্টে নেমে আসে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের শক্তিশালী অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা অব্যাহত থাকলে স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণের বাজারে চাপ থাকতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যবান ধাতুটির দামকে সমর্থন দিতে পারে।